জিপিএ ৫ পেয়েও অর্থাভাবে অনিশ্চিত ঝাড়বাড়ীর রুনার উচ্চ শিক্ষা

বাবা ও মায়ের সাথে রুনা
বাবা ও মায়ের সাথে রুনা

আমি বই পড়ছিলাম, বাবা এসে জিজ্ঞেস করলো “কিসের বই পড়?” আমি বললাম,অনার্স ভর্তি পরীক্ষার জন্যে বই পড়ছি। ” ভর্তি পরীক্ষার জন্যে বই পড়ার দরকার নাই, অনার্স পড়া লাগবে না, তুমি ডিগ্রী ভর্তি হবা।”

আমাদের অভাবের সংসার, বাবা একটা ছোট চায়ের হোটেল করেন ঝাড়বাড়ী বাজারে। আমি সহ আমার বাবা-মা আর চার বোনের সংসার । আমি সেজো। বড় দুই বোনের বিয়ে হয়েছে। দিনের রোজগার দিয়ে দিন পারি দেন আমার বাবা। আমাকে পড়া লেখা করাবে কি করে আমার পরিবার? প্রশ্ন ছুরে দিয়ে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষন। তারপর বলে, আমার বাবার কথায় আমি কষ্ট পাই না । কারন আমার বাবার অবস্থা আমি জানি।

সদ্য প্রকাশিত এইচ.এস.সিতে মানবিক বিভাগ থেকে জিপিএ ৫ পাওয়া রুণা আক্তার তার নিজ বাড়ি ঝাড়বাড়ী প্রসাদ পাড়ায় বসে এই সব কথা বলছিলেন। এবারের এইচ.এস.সিতে তুমুল ফল বিপর্যয়ের মধ্যেও দিনাজপুর বোর্ডের অধীনে বীরগঞ্জ থানার ঝাড়বাড়ী কলেজ থেকে মানবিক বিভাগে পরীক্ষা দিয়ে এমন তাক লাগানো ফল করেন রুণা। খোজ নিয়ে জানা গেছে, সমস্ত বীরগঞ্জ থানায় মোট ছয়টি কলেজ থেকে ১৭৩৭ জন পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয় । এই ছয়টি কলেজের মধ্যে মাত্র ছয় জন জিপিএ ৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়। বীরগঞ্জ সরকারি কলেজ থেকে পাঁচ জন আর ঝাড়বাড়ী কলেজ থেকে পায় এক জন জিপিএ ৫ ।

নিজের এমন ঈর্ষনীয় সাফল্য সম্পর্কে ধারনাই ছিলো না রুণার। জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো, এমন সাফল্যের পেছনের রহস্য কি? জবাবে রুণা বলেছেন, আমি শুধু পড়তাম। আমার না ছিলো আলাদা করে কোচিং করার সামর্থ্য, না ছিলো আলাদা প্রাইভেট পড়ার মতো আর্থিক স্বচ্ছলতা। যে স্যার এর কাছে প্রাইভেট পড়তাম সেই স্যারকে তার প্রাপ্য সন্মানীটাও দিতে পারি নাই ঠিক ভাবে। তবুও আমি উচ্চ শিক্ষার স্বপ্ন দেখি, ভালো একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার স্বপ্ন দেখি।”

এই অভাবের মধ্যেও আমাকে পড়া শোনার জন্যে তুমুল প্রেরণা দিয়ে এসেছেন আমার মা আর আমার কলেজের বাংলা স্যার। শোনেন ভাই, পেপারে কিন্তু রব্বানী স্যারের (বাংলা স্যার) নাম অবশ্যই লিখবেন।বলেই একটা মুচকি হাসি দিলেন রুণা।

কথা বলতে চাইলাম তার মা রহিতন বেগমের সাথে। খালা মারা যাওয়ার কারনে তার মা বাড়িতে ছিলো না তাই আর কথা হলো না । ইতমধ্যেই রুণার বাবা নুর ইসলাম এসে হাজির। তার মেয়ের সাফল্যে খুশি হতে পেরেছেন কিনা প্রশ্ন করায়, গুছিয়ে কোন উত্তর দিতে পারলেন না। তবে উনি খুব কষ্টের সাথে যা জানালেন তার সারমর্ম হচ্ছে, “অর্থাভাবে আমি আমার সোনার টুকরা মেয়েটাকে তার যোগ্য জায়গায় পড়াতে পারছি না।” একটা অপরাধ বোধ কাজ করছে তার মাঝে।

রুণার সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয় তার অঘোষীত অবিভাবক ঝাড়বাড়ী কলেজের বাংলা প্রভাষক গোলাম রব্বানীর কাছে। তিনি বলেন,”অসম্ভব রকম মেধাবিনী এই মেয়েটা। তীব্র জানার আগ্রহ আর চিন্তা চেতনায় ভীষণ রকম সৎ রুণা। নিজের কাজকে কখনো অবহেলা না করা আর পড়া শোনার প্রতি তীব্র আকাংখাই তাকে এমন ফলাফল এনে দিয়েছে। আমরা বা আমি শুধু শিক্ষক অথবা ছোট বোন হিসেবে সামর্থ্য মতো গাইড লাইন করেছি এই আর কি?”

রুণা সম্পর্কে ঝারবাড়ী কলেজের অধ্যক্ষ আনোয়ার হোসেন বলেন, এমন একটা অদম্য মেধাবী ছাত্রীকে কোন ভাবেই অর্থের অভাবে উচ্চ শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করা ঠিক হবে না । আমি আমাদের সাধ্যমত রুণাকে তার স্বপ্নের দিকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করবো। আর গণ মাধ্যমের দ্বারা দেশের বিত্তবানদের প্রতি আমার আহব্বান রইলো। আপনারা রুণার স্বপ্ন পুরণে সহযোগিতার হাত নিয়ে এগিয়ে আসুন । এমন একজন রুণাকে সুন্দর একটা ভবিষৎ উপহার দিন।

ফিরে আসবার সময় রুণাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো । রেজাল্ট তো ভালো হয়েছে সব কিছু ঠিক থাকলে আপনার ভবিষৎ চিন্তা ভাবনা কি? জবাবে দু চোখে চিকচিকে স্বপ্ন নিয়ে রুণা বলেছিলো। ” আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে চাই। পড়া শোনা শেষ করে চাকুরি করে অনেক বড় আর সুন্দর একটা বাড়ি বানাতে চাই। যেনো আমাদের পরিবারের সবাইকে নিয়ে সেখানে অনায়েসে থাকতে পারি।”

রুণার স্বপ্নটা হয়তো সত্যি হবে যদি অর্থাভাবে তার উচ্চ শিক্ষাটা ব্যাহত না হয়। কারোও সহযোগিতাই পারে রুণাকে তার স্বপ্নটা বাস্তবে পরিণত করে দিতে। কেউ সহযোগিতা করলে যোগাযোগ করতে পারেন রুনার পরিবারের সাথে। রুনার অবিভাবক ও শিক্ষক গোলাম রব্বানী ফােন: 01750-581538

সর্বশেষ আপডেট: ১৩ আগস্ট ২০১৭, ১৬:৪৪
ডেস্ক রিপোর্ট

পাঠকের মন্তব্য

সর্বশেষ আপডেট


বিনোদন