পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়িদের জীবনযাত্রা

পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়িদের জীবনযাত্রা।
পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়িদের জীবনযাত্রা।

পার্বত্য চট্টগ্রাম ছোটো,কিন্তু অধিকাংশের চোখে এটি মহাজগতের মতোই অস্পষ্ট। পার্বত্য চট্টগ্রাম ভরে আছে পাহাড়ে, উত্তর -দক্ষিণে বিছানো পাহাড়ের পর পাহাড়মালা ওই অঞ্চলকে সাজিয়েছে বিস্ময়কর রুপে- যে বিস্ময় সহ্য করা কঠিন হৃদপিন্ডের পক্ষে।পার্বত্য চট্টগ্রাম রুপময় :অত্যন্ত ভিন্ন তার রুপ সমতল অঞ্চলের থেকে। এখানে পাহাড়িদের জীবন যাপনের সংগ্রামের বাতাসের ঢেউ খেলে।যেখানে আগে আর এখনো দূর্গম এলাকায়(নাড়াইছড়ি,সাজেক)ভাতহীন পেটের মানুষের সন্ধান পাওয়া যায়। আদিমযুগের চিত্র একমাত্র বাংলাদেশের পাহাড়িদের পার্বত্য অঞ্চলেই খোঁজ মেলে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে দশ ভাষাভাষীর ১২ টি আদিবাসি গোষ্ঠী বসবাস করে। এখানে প্রত্যেক আদিবাসি সম্প্রদায়ের নিজস্ব ভাষা সংস্কৃতি ও আলাদা সমাজ ব্যবস্তা রয়েছে। জনসংখ্যা অনুপাতের দিক দিয়ে আদিবাসিদের মধ্যে চাকমারা বেশি।চাকমা এবং ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের লোকেরা মাটি থেকে ৪/৫ হাত উঁচু করে গাছ/বাঁশের খুঁটির উপর ম্যাচাং ঘর তৈরি করে, তারা ড্রয়িং রুমকে চানাহ,অতিথি ও অবিবাহিত পুরুষদের শোবার ঘরকে সিংবা বলে,মেয়েদের রান্না ঘরকে পিজোর বলে। পার্বত্য চট্টগ্রামে মাইলের পর মাইল ধানক্ষেতের বাতাস ঢেউ খেলে যায়না। সেখানে পাহাড়ের পাদদেশে দাঁড়ালে চোখের সামনে শুধু অভাবিত বিস্ময়!

এমন আরন্য পাহাড় অঞ্চল ১৯৯৭ এর আগে বিদ্রোহীদের জন্য স্বর্গ; তারা স্বর্গের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে যেতে পারত অবলীলায়,যেখানে শীতে বরফ জমেনা, পায়ের নিচে মরুভূমি জ্বলেনা এবং পাথরের আঘাতে পা থেকে রক্ত ঝরেনা;বরং ছায়া দেয় চিরহরিৎ বৃক্ষ,তৃষ্ণা মেটায় ঝরনাধারা, আশ্রয় দেয় নিবিড় উপত্যকা। সেখানে আগে আর এখনো চোখে পড়ে আগুনে পোড়া পাহাড়।যেনো আগুন লেগে পুড়ে গেছে পাহাড় গুলোর ছাল; দেখে কষ্ট হয়। কিন্তু পাহাড় না পুড়িয়ে উপায় নেই,সেখানে চাষের জন্য সমভুমি বেশি নেই। তাই পাহাড়িরা পাহাড় পুড়ে পাহাড়ের গায়ে জুম চাষ করে একই সাথে বুনে কয়েক রকম ফসল।দু-তিন বছর পুড়ে নিস্তেজ হয়ে উঠে পাহাড়ের মাটি, সেখানে আর ফসল ভালো ফসল জন্মেনা। তাই পাহাড়িরা আগেকার সময়ে ছয়-সাত বছর পর পর পাহাড় বদলাতো।কিন্তু বর্তমানে জনসংখ্যা বেশি হওয়ায় দু -তিন বছর পর পর বদলাতে হচ্ছে।ফলে বাড়ছেনা ফসল,হচ্ছেনা উন্নয়ন।

তাদের জীবন একধরনের পাহাড়ি যাযাবরের। সুতরাং এই দিক দিয়ে পাহাড়িদের জীবন তেমন পাল্টায় নি।পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়িদের মধ্যে চাকমা ৩০৬৬১৬,মারমা(মগ)১৭৬২৩০,ত্রিপুরা ১০২৪৫৫,মুরং ৩২০৯৮,তঞ্চগ্যা ২১১৪০,বৌম ৫৫৮৪, পাংখু ১৬৬৮,খুমি ১০৯১,উসাই ৯৬৬ জন।তবে পুরো পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙ্গালী /অপাহাড়ির সংখ্যা ৩১১৩৬৮ জন।১৯৭৯ হতে বিপুল পরিমান বাঙ্গালীর সুপরিকল্পিত অভিবাসনের ফলে পাহাড়া এখন বাঙ্গালীদের হয়ে উঠেছে, বাঙ্গালীরা এখন পাহাড়ি হয়ে উঠেছে। এবং এটা পাহাড়ে অশান্তির এটা এক বড় সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পাহাড়ে ব্যবসা বানিজ্য আর বাঙ্গালিদের সংস্কৃতি এখন পাহাড়িদের উপর ছোয়া লেগেছে।এদিক থেকে ওনেকটা উন্নয়ন লক্ষ্য হলেও ক্ষতির দিক ও কম নয়।ব্যবসা বানিজ্যর প্রভাবে পাহাড়িরা অদক্ষ হওয়াতে উৎপাদিত দ্রব্যর ন্যায্য মূল্য তারা পান না।খাগড়াছড়ি জেলার উত্তর সীমান্তে দুর্গম এলাকা নাড়াইছড়ি গ্রাম অবস্থিত। সেখানে প্রায় ১০-১৫ হাজার মানুষের বসবাস। কিন্তু সেখানে দ্রব্য বিক্রি করারা মতো নেই একটা বাজার।ফলে জমিতে অধিক ফলন হলেও পাহাড়িদের অধিকাংশ ফসল নষ্ট হয়ে যায়। যেখানে বাজার নেই সেখানে উন্নতি নেই।৩০-৪০ কি.মি দূরে একদিন হেটে বাবুছড়া বাজারে উপর নির্ভর করতে হয় তাদের।শিক্ষা ক্ষেত্রে ৩-৪ টা প্রাইমারি স্কুল মাত্র। সেখানে উচ্চ শিক্ষার জন্য ১৯৭১ সাল হতে এখনো উচ্চ বিদ্যালয় গড়ে উঠেনি।ফলে অধিকাংশ মেধাবি ছাত্র প্রাইমারি স্কুল পর্যন্ত পড়ে হয়ে যায় নিরক্ষর। এদিক থেকেও তেমন পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়না।অধিকতর গড়ে উঠেছে বিজিবি ক্যাম্প, সাজেকে পর্যটন ইত্যাদি। এগুলো অনেকটা কাজে আসলেও তবে শিক্ষা ক্ষেত্রে বিষয়টি গড়ে তোলা জরুরি ছিল।পার্বত্য অঞ্চলে হারিয়ে যাচ্ছে পাহাড়িদের ঐতিহ্য আর সংস্কৃতি। ফলে পাহাড়ি সমাজের বিবর্তনে আজ জীবনকাল আর সমাজ ব্যবস্থা পুরোটা বাঙ্গালিদের সাদৃশ্য। বর্তমান যুগের সাথে পাহাড়িরা তাল মেলাতে অনেক তরুন তরুনী আজ শহরে নানা শিল্পতে কাজ করতে বাধ্য।কারণ পাহাড়িদের পুরানো অর্থনীতি আজ ভেংগে পড়েছে। ফলে পাহাড়িদের অর্থনৈতিক সমাজ ব্যবস্থা বাঙ্গালিদের সাথে সাথে পরিবর্তিত। আর সেই অর্থনৈতিক তো পুঁজিতান্ত্রিক।

বর্তমানে পার্বত্য অঞ্চলে অনেক গুলো পর্যটন শিল্প গড়ে উঠেছে।কিন্তু এই শিল্প পাহাড়িদের জন্য অর্থনীতির মুক্তিতে তেমন ভূমিকা রাখছে না ।এসব পর্যটন শিল্প শুধুমাত্র দেশের শোভা প্রাপ্ত।নানা রং বেরংগের মানুষ আজ সাজেক ভ্যালিতে দেখা মেলে।কিন্তু এসব হাসি খুশির মাঝে লুকিয়ে আছে শত পাহাড়িদের কান্না।রাংগামাটিতে অধিকাংশ জমিতে আনারস,কাঠাল, কমলা ইত্যাদি ফলের উৎপাদন বাহার। কিন্তু সেসব ফল ফলাদির মালিকরা(পাহাড়ি) ব্যবসায়ী দের বিবেকের কাছে পরাজিত হতে হয়।প্রতি আনারস খুবই কম মূল্য হারে বিক্রি করতে হত তাদের।যদি পার্বত্য অঞ্চলে আজ কোথাও না কোথাও ফলের শিল্প কারখানা থাকতো তবে তাদের দূর্ভোগে পড়তে হতোনা।শহরে গ্রামে সমাজ ব্যবস্থা অনেক উন্নতি হত।তবুও থেমে নেই জীবিকার সংগ্রাম।এই অল্প পুঁজিতে তারা আজ অনেক সচেতন। ছেলে মেয়েদের সুশিক্ষায় গড়ে তুলতে এই অল্প পুঁজিতে যথেষ্ট। পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়িদের জন্য কৃষিভিত্তিক শিল্প কারখানা হওয়া উচিত ছিল।কারণ এদিক দিয়ে অনেক মানুষ অর্থনৈতিক ভাবে কিছুটা মুক্তি পেত।পর্যটন না হয়ে হতে পারতো একটা শিক্ষা  ক্ষেত্রে উচ্চ বিদ্যালয়। তবে অনেক পাহাড়ি উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হতো।পর্যটন শিল্পে পাহাড়িদের জুম চাষে উৎপন্নজাত দ্রব্য খুবই কম ব্যবহৃত। ফলে অধিকাংশ উৎপন্ন দ্রব্য নষ্ট হয়ে যায়।আর বাজারজাতকরণ হলেও জুম্মরা ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত। আর অন্যদিকে চেংগী, মাইনী, কর্ণফুলী, কাচালং, রাইংখিয়ং নদী মিলে ১৯৬১ সালে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণ করা হয়।এতে ২,২৭,৪০০ একর জমি পানিতে ঢুবে যায়।ফলে বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রায় ১৮ হাজার পাহাড়ি পরিবার।

কাপ্তাই পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্র হতে দৈনিক বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় ২ শত ৩ মেগাওয়াট। ফলে সারা দেশে আজ বিদ্যুতের কমতি নেই।সারাদেশ আজ আলোকিত। অবদান রেখেছে সবুজ পাহাড়ের কাপ্তাই বিদ্যুৎ কেন্দ্র।কিন্তু এতে রাংগামাটি জেলায় প্রতিদিন মাত্র ৫ হতে ১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ খরচ করা হয়।এই কাপ্তাই বাঁধ যেন হয়ে উঠেছে পাহাড়িদের মরণ ফাঁদ। সিংহ ভাগের ভিটাটুকু জায়গা নিয়ে পাহাড়ি বাংগালিদের সংগ্রামের শেষ নেই।যেখানে পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় তা এখনো অপূর্ণ রয়েছে।ফলে পাহাড়ের মানুষ আজ অনেক শোষিত। বলতে গেলে পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়িদের জীবিকা অনেক কষ্টের।

সর্বশেষ আপডেট: ২৫ নভেম্বর ২০১৭, ২৩:৪৫
অনন্ত চাকমা
রাঙ্গামাটি প্রতিনিধি

পাঠকের মন্তব্য

সর্বশেষ আপডেট


বিনোদন